কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
প্রথমবার আমাদের বন্ধুদের সাথে কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করার
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন আমাদের বাজেট ছিল খুবই সীমিত। অনেকেই আমাদের বলেছিলেন
যে এত কম টাকায় দ্বীপের নীল পানি দেখা অসম্ভব, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে
আমরা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছিলাম।
যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে দূরে সাগরের বুকে জেগে থাকা একমাত্র প্রবাল দ্বীপে
যাওয়ার আনন্দ আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের সব ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর করে
দিতে পারে। আমাদের নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা সাশ্রয়ী উপায়গুলো নিয়েই
আজকের এই সম্পূর্ণ গাইডলাইন।
পোস্ট সূচিপত্রঃ কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
- কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
- ঢাকা থেকে টেকনাফ যাওয়ার সাশ্রয়ী বাস সার্ভিস
- টেকনাফ থেকে দ্বীপে যাওয়ার কম খরচের জাহাজ ও ট্রলার
- দ্বীপে কম ভাড়ায় থাকার হোটেল বা কটেজ খোঁজা
- কম খরচে ঐতিহ্যবাহী সামুদ্রিক মাছ ও খাবারের হোটেল
- ছেঁড়া দ্বীপ পরিদর্শনের একদম সাশ্রয়ী উপায়
- অফ-সিজনে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সুবিধা ও অসুবিধা
- দলগত বা গ্রুপ ট্রাভেলের মাধ্যমে খরচ কমানোর ট্রিকস
- সেন্ট মার্টিন ট্যুরে অপচয় এড়ানোর কিছু বাস্তব পরামর্শ
- শেষ কথাঃ কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
আমাদের দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের নীল পানি দেখার স্বপ্ন কার না
থাকে, কিন্তু অনেকেই বাজেটের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে যান। আমি নিজে যখন প্রথমবার
কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ সম্পন্ন করেছিলাম, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে
সঠিক পরিকল্পনা থাকলে খুব অল্প টাকাতেই এই সুন্দর দ্বীপ ঘুরে আসা সম্ভব। আমরা যদি
বিলাসবহুল লাইফস্টাইল পরিহার করে লোকাল মাধ্যমগুলো ব্যবহার করি, তবে আমাদের
পকেটের ওপর বাড়তি কোনো চাপই পড়বে না। আমাদের এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আজ আপনাদের সাথে
শেয়ার করব যেন আপনারা সহজে পথ চলতে পারেন।
সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত,
কারণ এই সময়ে সমুদ্র শান্ত থাকে এবং পর্যটন জাহাজগুলো নিয়মিত চলাচল করে। আমরা
আমাদের বন্ধুদের একটি গ্রুপ নিয়ে যখন এই ট্যুরের ছক আঁকছিলাম, তখন আমাদের মূল
লক্ষ্য ছিল প্রতি পদে খরচ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। এই ভ্রমণের প্রতিটি ধাপে আমরা যে
সাশ্রয়ী উপায়গুলো খুঁজে পেয়েছি, সেগুলোই আজ আমি আপনাদের সাথে বিস্তারিতভাবে
আলোচনা করব। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো মানসিক প্রস্তুতি এবং অপ্রয়োজনীয়
আরাম-আয়েশ কিছুটা ত্যাগ করার মানসিকতা।
ঢাকা থেকে টেকনাফ যাওয়ার সাশ্রয়ী বাস সার্ভিস
সেন্ট মার্টিন যাওয়ার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো ঢাকা থেকে টেকনাফ জেটি ঘাটে
পৌঁছানো এবং এই যাতায়াতের ক্ষেত্রে এসি বাসের চেয়ে নন-এসি বাস বেছে নেওয়া আমাদের
বাজেটকে অনেক কমিয়ে দেয়। আমি এবং আমাদের বন্ধুরা ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল
থেকে জোনাকি, শ্যামলী বা এস আলমের মতো নন-এসি বাসের টিকিট কেটেছিলাম যা এসি বাসের
তুলনায় প্রায় অর্ধেক দাম ছিল। রাতের বাসে রওনা দিলে সকালের মধ্যে টেকনাফ ঘাটে
পৌঁছে যাওয়া যায়, যা আমাদের সময় এবং টাকা দুটোই বাঁচিয়ে দেয়। এই জার্নিটা কিছুটা
ক্লান্তিকর হলেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে বেশ ভালোভাবেই কেটে যায়।
বাসের টিকিট কাটার সময় আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা সরাসরি টেকনাফগামী
বাসের টিকিট কাটি, কারণ কক্সবাজার হয়ে গেলে বাড়তি লোকাল ভাড়া এবং সময় নষ্ট হয়।
আমরা যদি অফ-সিজনে বা সপ্তাহের মাঝের দিনগুলোতে ভ্রমণ করি, তবে বাসের টিকিটে
কিছুটা ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে যা আমাদের বাজেট ধরে রাখতে সাহায্য করে। বাসে
চড়ার আগে কিছু শুকনো খাবার ও পানির বোতল ঢাকা থেকেই কিনে নেওয়া ভালো, কারণ
হাইওয়ের রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি থাকে। এই ছোটখাটো
বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে যাতায়াত খরচ অনেক নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
টেকনাফ থেকে দ্বীপে যাওয়ার কম খরচের জাহাজ ও ট্রলার
টেকনাফ জেটি ঘাটে পৌঁছানোর পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাওয়ার জন্য কেয়ারি সিন্দাবাদ
বা অন্যান্য বড় জাহাজের পাশাপাশি কিছু লোকাল কাঠের ট্রলারও পাওয়া যায়। তবে
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবং বাজেট ফ্রেন্ডলি হিসেবে জাহাজের একদম সাধারণ ওপেন
ডেক বা গ্যালারি ক্লাসের টিকিট কেনা আমাদের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী সমাধান ছিল। আমরা
জাহাজের আপার ক্লাসের বিলাসবহুল টিকিট না কেটে সাধারণ টিকিট কেটেই সমুদ্রের
চমৎকার হাওয়া এবং নীল পানির ওপর গাঙচিল ওড়ার দৃশ্য দারুণভাবে উপভোগ করেছিলাম।
ওপেন ডেকে বসার অভিজ্ঞতা লাক্সারি কেবিনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
জাহাজের টিকিট সাধারণত আপ-ডাউন অর্থাৎ যাওয়া ও আসার টিকিট একসাথে কাটলে কিছুটা
টাকা সাশ্রয় হয় যা আমরা নিজেরা বুকিং করার সময় দেখেছিলাম। জেটি ঘাটে টিকিট কাটার
সময় কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি অফিশিয়াল কাউন্টার থেকে টিকিট নেওয়া
আমাদের নিজেদের আর্থিক সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ। জাহাজে প্রায় আড়াই
থেকে তিন ঘণ্টার এই চমৎকার নদী ও সমুদ্র যাত্রার অভিজ্ঞতা আমাদের পুরো টিমের
ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দিয়েছিল। নাফ নদী পার হয়ে যখন আমরা বিশাল সমুদ্রে
প্রবেশ করছিলাম, সেই মুহূর্তটি আমাদের সারাজীবন মনে থাকবে।
দ্বীপে কম ভাড়ায় থাকার হোটেল বা কটেজ খোঁজা
সেন্ট মার্টিনে পৌঁছেই মেইন জেটি ঘাটের আশেপাশের হোটেলগুলোতে রুমের দাম সাধারণত
অনেক বেশি চাওয়া হয় যা আমাদের বাজেট ট্যুরের পরিপন্থী। তাই আমি আমার অভিজ্ঞতা
থেকে বলব, জেটি ঘাট থেকে একটু ভেতরের দিকে বা পশ্চিম সৈকতের কাছাকাছি লোকাল
মানুষের কটেজগুলোতে কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ এর জন্য আদর্শ থাকার
জায়গা পাওয়া যায়। আমরা ঘাটের কোলাহল ছেড়ে একটু ভেতরের দিকে গিয়ে একটি
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ফ্যামিলি কটেজ পেয়েছিলাম যার ভাড়া ছিল মেইন রোডের হোটেলের
তুলনায় অনেক কম। বাজারে বা ঘাটের কাছে না থেকে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাটা বেশ
উপভোগ্য।
আমরা যদি দলগতভাবে ভ্রমণ করি, তবে একটি বড় রুমে চার থেকে পাঁচ জন অনায়াসে শেয়ার
করে থাকতে পারি যা মাথাপিছু হোটেলের খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমিয়ে দেয়। ছুটির দিন
যেমন শুক্র ও শনিবার এড়িয়ে রবি থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে দ্বীপে থাকলে হোটেলের
ভাড়া প্রায় অর্ধেক নেমে আসে যা আমাদের বাজেটকে শতভাগ সফল করতে সাহায্য করেছিল।
হোটেল বুক করার সময় কোনো অনলাইন এজেন্সির চেয়ে সরাসরি কটেজ মালিকের সাথে কথা বলে
কিছুটা দরদাম করে নেওয়া আমাদের জন্য বেশ লাভজনক হয়েছিল। প্রবাল দ্বীপে সাশ্রয়ী
থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয় যদি আপনি একটু খোঁজেন।
কম খরচে ঐতিহ্যবাহী সামুদ্রিক মাছ ও খাবারের হোটেল
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে খাবারের দাম একটু বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক কারণ সেখানে সব
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলারে করে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। তবে বিচ
সাইডের চাকচিক্যময় রেস্টুরেন্টগুলোতে না খেয়ে বাজারের ভেতরের সাধারণ ভাতের
হোটেলগুলোতে খেলে খুব কম খরচে পেট ভরে তাজা সামুদ্রিক মাছ খাওয়া সম্ভব। আমরা
আমাদের তিন বেলার খাবারের জন্য বাজারের ভেতরের একটি লোকাল হোটেল বেছে নিয়েছিলাম
যেখানে ডাল, ভাত, ভর্তা আর রূপচাঁদা বা কোরাল মাছের দাম ছিল খুবই সাশ্রয়ী ও
মানসম্মত। বিচের রেস্টুরেন্টগুলো সাধারণত পর্যটকদের পকেট কাটার জন্য বসে থাকে।
সকালের নাস্তার জন্য খিচুড়ি বা পরোটা-ভাজি খাওয়া আমাদের পকেটের জন্য বেশ আরামদায়ক
ছিল এবং বিকেলের দিকে দ্বীপের ডাবের পানি খাওয়া আমরা মিস করিনি। আমরা খাবার
অর্ডার করার আগেই সবসময় মেনুর দাম এবং সার্ভিং সাইজ হোটেল বয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত
করে নিতাম যাতে বিল দেওয়ার সময় কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।
দলগতভাবে ভ্রমণ করলে খাবারের মিল সিস্টেম করা অনেক সহজ হয় এবং এতে অপচয় কম হওয়ার
পাশাপাশি খরচও অনেক কমে আসে। তাজা সামুদ্রিক মাছের স্বাদ নেওয়ার জন্য বেশি টাকা
খরচ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
ছেঁড়া দ্বীপ পরিদর্শনের একদম সাশ্রয়ী উপায়
সেন্ট মার্টিনের মূল আকর্ষণের একটি হলো ছেঁড়া দ্বীপ, যা জোয়ারের সময় মূল দ্বীপ
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই অতুলনীয়। ছেঁড়া দ্বীপে
যাওয়ার জন্য জেটি ঘাট থেকে অনেক স্পিডবোট বা ট্রলার ভাড়া পাওয়া যায়, তবে সেগুলোর
ভাড়া আমাদের বাজেট ট্যুরের জন্য কিছুটা বেশি ছিল। তাই আমরা আমাদের পুরো গ্রুপ
নিয়ে সকাল সকাল পায়ে হেঁটে অথবা স্থানীয় ভ্যান বা সাইকেল ভাড়া করে ছেঁড়া দ্বীপের
উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম যা ছিল অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং রোমাঞ্চকর। পায়ে হেঁটে
যাওয়ার কারণে আমরা দ্বীপের আসল রূপ দেখতে পেয়েছিলাম।
ভাটার সময় সেন্ট মার্টিনের মেইন বিচ থেকে ছেঁড়া দ্বীপ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায়
এবং এই হেঁটে যাওয়ার পথে চারপাশের সামুদ্রিক প্রবাল ও নীল পানির রূপ আমরা খুব কাছ
থেকে উপভোগ করেছি। সাইকেল ভাড়া করলে পুরো দিনের জন্য খুব অল্প টাকায় দ্বীপের এক
প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো যায় যা আমাদের যাতায়াত খরচকে অনেক
বাঁচিয়ে দিয়েছিল। পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে ভ্রমণের এই সিদ্ধান্ত আমাদের শুধু টাকাই
বাঁচায়নি, বরং প্রকৃতির একদম নিখাদ সৌন্দর্যকে নিজেদের ক্যামেরায় বন্দি করার এক
অনন্য সুযোগ করে দিয়েছিল।
অফ-সিজনে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সুবিধা ও অসুবিধা
আপনি যদি একদম পানির দামে দ্বীপটি ঘুরে আসতে চান, তবে অক্টোবর বা এপ্রিল মাসের
মতো অফ-সিজনে কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করার পরিকল্পনা করতে পারেন।
এই সময়ে দ্বীপে পর্যটকদের ভিড় একদম থাকে না বললেই চলে, যার ফলে হোটেল মালিকরা এবং
কটেজ ব্যবসায়ীরা খুব কম দামেই রুম ভাড়া দিয়ে থাকেন। আমরা একবার অক্টোবরের শুরুতে
গিয়েছিলাম এবং তখন যাতায়াত ও থাকার খরচ সিজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লেগেছিল যা
আমাদের অবাক করেছিল। শান্ত ও নির্জন বিচে একা বসে সমুদ্রের গর্জন শোনার অনুভূতি
সত্যিই অন্যরকম।
তবে অফ-সিজনে ভ্রমণের কিছু অসুবিধাও রয়েছে যেমন এই সময়ে বড় বড় বিলাসবহুল পর্যটন
জাহাজগুলো নিয়মিত চলাচল করে না। তখন একমাত্র ভরসা হলো কাঠের ট্রলার বা স্পিডবোট,
যা উত্তাল সমুদ্রে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে আমি মনে করি। এছাড়াও অনেক ভালো
খাবারের দোকান এই সময়ে বন্ধ থাকে, তাই যাওয়ার আগে আবহাওয়া কেমন থাকবে এবং স্থানীয়
যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল আছে কিনা তা আমাদের ভালো করে নিশ্চিত করতে হবে। সবদিক
বিবেচনা করলে অফ-সিজনের ভ্রমণ অত্যন্ত সাশ্রয়ী হলেও কিছুটা রোমাঞ্চকর ও
চ্যালেঞ্জিং।
দলগত বা গ্রুপ ট্রাভেলের মাধ্যমে খরচ কমানোর ট্রিকস
আমার দীর্ঘ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি যে একা ভ্রমণের চেয়ে গ্রুপ বা
দলগতভাবে ভ্রমণ করলে খরচ অবিশ্বাস্য রকমের কমে যায়। আমরা যখন ১০ থেকে ১২ জনের
একটি টিম তৈরি করে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তখন বাসের টিকিট
থেকে শুরু করে কটেজের রুম এবং ট্রলার ভাড়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ডিসকাউন্ট
পেয়েছিলাম। যেকোনো খরচ যখন সবার মাঝে সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়, তখন মাথাপিছু ব্যয়ের
পরিমাণ আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক কম হয়। একা একা ভ্রমণ করলে এই সুবিধাগুলো পাওয়া
কখনোই সম্ভব নয়।
গ্রুপ ট্রাভেলের আরেকটি বড় সুবিধা হলো খাবারের ক্ষেত্রে বড় অর্ডার দিলে
রেস্টুরেন্ট মালিকরা কিছুটা কম দামে ভালো মেনু সেট করে দিতে রাজি হন। আমরা
প্রতিদিনের খরচের হিসাব রাখার জন্য আমাদের গ্রুপের একজন বন্ধুকে ক্যাশিয়ার
বানিয়েছিলাম যিনি নিখুঁতভাবে সব হিসাব ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। এতে আমাদের বাজেটের
ওপর একটি ভালো নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং কোনো অপ্রয়োজনীয় খাতে আমাদের টাকা অপচয় হয়নি যা
আমাদের বাজেট ট্যুরকে সফল করতে সাহায্য করেছিল। দলগত ভ্রমণ আমাদের নিজেদের
বন্ধনকে মজবুত করার পাশাপাশি খরচও বাঁচায়।
সেন্ট মার্টিন ট্যুরে অপচয় এড়ানোর কিছু বাস্তব পরামর্শ
দ্বীপে গিয়ে অনেক সময় আমরা আবেগের বশে এমন কিছু জিনিস কিনে ফেলি বা এমন কিছু
রাইডে চড়ি যা আমাদের পকেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। যেমন সমুদ্রের তীরে শুয়ে
থাকার জন্য যে ছাতা বা কিটকট বেঞ্চগুলো ভাড়া পাওয়া যায়, সেগুলোর ঘণ্টাভিত্তিক
চার্জ বেশ চড়া হতে পারে যা এড়িয়ে চলা সম্ভব। আমি এবং আমাদের বন্ধুরা বিচের বালিতে
চাদর বিছিয়ে বসতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলাম যা আমাদের কোনো বাড়তি খরচ
ছাড়াই সমুদ্র উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছিল। প্রকৃতির আসল মজা বালিতে বসে পা ভেজানোর
মাঝেই পাওয়া যায়।
এছাড়াও বিচ সাইডের ছোটখাটো স্যুভেনির শপ বা শামুক-ঝিনুকের তৈরি জিনিসপত্র কেনার
সময় আমাদের বেশ ভালো মতন দরদাম করতে হবে কারণ পর্যটক দেখলে তারা অনেক বেশি দাম
চায়। দ্বীপে মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেটের চার্জ বা অন্যান্য খরচ কিছুটা বেশি
হতে পারে, তাই ঢাকা থেকেই পর্যাপ্ত টকটাইম ও ডাটা প্যাক রিচার্জ করে নেওয়া ভালো।
নিজের অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছাগুলোকে একটু নিয়ন্ত্রণে রাখলে খুব সীমিত বাজেটের মধ্যেই
একটি স্মরণীয় এবং দারুণ ট্যুর শেষ করা সম্ভব যা আমরা নিজেরা করে দেখিয়েছি।
শেষ কথাঃ কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ
সেন্ট মার্টিন আমাদের দেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক রত্ন এবং সঠিক গাইডলাইন জানা
থাকলে কম খরচে ঢাকা থেকে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। আমি আমার
নিজের বাস্তব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে যে সাশ্রয়ী উপায় এবং কৌশলগুলো আপনাদের সাথে
শেয়ার করলাম, তা মেনে চললে আপনারাও খুব অল্প বাজেটে এই নীল পানির রাজ্যে ঘুরে
আসতে পারবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভ্রমণের আসল আনন্দ বিলাসবহুল হোটেলে নয়,
বরং প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং বন্ধুদের সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর মাঝে
লুকিয়ে থাকে।
তবে দ্বীপে ঘোরার সময় আমাদের একটি বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সচেতন হতে হবে, আর তা হলো
আমাদের পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা। সেন্ট মার্টিনের প্রবাল এবং সামুদ্রিক
জীববৈচিত্র্য বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে যা
আমাদের সবার জন্যই চিন্তার বিষয়। আমরা সেখানে গিয়ে চিপসের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের
বোতল সাগরে বা বিচে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলব এবং একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন
পর্যটক হিসেবে আমাদের দেশের এই সুন্দর সম্পদকে রক্ষা করব। আমাদের সচেতনতাই পারে
এই সুন্দর দ্বীপটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে।



রাফিকা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url